Friday, September 4, 2026

ইথারের আকাশে স্বাধীনতার সুর এবং নেতাজীর অগ্নিঝরা কণ্ঠ

ইথারের আকাশে স্বাধীনতার সুর এবং নেতাজীর অগ্নিঝরা কণ্ঠ

গভীর রাতে শর্টওয়েভ রেডিওর ডায়ালটা যখন আমরা ধীরে ধীরে ঘোরাই, স্পিকার থেকে ভেসে কিছু অস্পষ্ট খসখসে শব্দ। শব্দের ওঠানামা আর নয়েজের আড়ালে আসলে কী খুঁজে ফেরেন বেতার প্রেমিকেরা? একজন প্রকৃত বেতারপ্রেমী বা DXer-এর কাছে এটা কেবল কোনো প্রযুক্তি বা যান্ত্রিক শব্দ নয়। এটি হলো সময় আর দূরত্বের সীমানা পেরিয়ে ভেসে আসা এক জীবন্ত ইতিহাস। স্যাটেলাইট কিংবা উচ্চগতির ইন্টারনেটের বহু আগেই, পৃথিবীর দূর-দূরান্তের মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছিল এই শর্টওয়েভ বা উচ্চ-কম্পাঙ্কের রেডিও তরঙ্গ।

আন্তর্জাতিক সম্প্রচারের ইতিহাসে  হাজারো স্মরণীয় মুহূর্ত আছে। কিন্তু নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর বেতার যুদ্ধ ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং আবেগঘন এক ঘটনাক্রম। ব্রিটিশদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে একটি অদৃশ্য বেতার তরঙ্গকে তিনি বিপ্লবের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার বানিয়েছিলেন, তা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।

ইথারের বুকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দেওয়া কণ্ঠ

১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাস। কলকাতার এলগিন রোডের বাড়ি থেকে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে নেতাজীর সেই মহানিষ্ক্রমণের কথা আমাদের সবারই জানা। তিনি যখন আফগানিস্তান হয়ে ইউরোপে পৌঁছান, ব্রিটিশ সরকার তখন রটিয়ে দিয়েছিল যে তিনি আর বেঁচে নেই কিংবা বন্দি হয়েছেন।

ঠিক তখনই, ১৯৪২ সালের ৭ জানুয়ারি, রেডিওর খসখসে স্ট্যাটিকের বুক চিরে এক বজ্রকণ্ঠ ভেসে এল:

"দিস ইজ সুভাষচন্দ্র বসু স্পিকিং টু ইউ ওভার দ্য আজাদ হিন্দ রেডিও..."

জার্মানির শক্তিশালী শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে ভেসে আসা সেই একটিমাত্র বাক্য পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কোটি কোটি ভারতীয় তখন ঘরের দরজা বন্ধ করে গোপনে রেডিওর ডায়াল ঘুরিয়ে শুনছিলেন সেই কণ্ঠ। নিমেষেই চুরমার হয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশদের মিথ্যা প্রচার।

নেতাজী খুব ভালো করেই জানতেন যে বেতার তরঙ্গকে কীভাবে মানসিক যুদ্ধের হাতিয়ার বানাতে হয়। ব্রিটিশদের রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রকে কড়া জবাব দিতে তিনি বিবিসি (BBC)-কে কটাক্ষ করে বলতেন "ব্লফ অ্যান্ড ব্লাস্টার কর্পোরেশন" আর অল ইন্ডিয়া রেডিও (AIR)-তাঁর কাছে ছিল "অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান রেডিও"। প্রতিটা সম্প্রচারের শুরুতে বাহাদুর শাহ জাফরের সেই ঐতিহাসিক পঙ্ক্তিগুলো যখন বেজে উঠত, ভারতীয়দের মনে জ্বলে উঠত এক নতুন আশার আলো ।

টোকিও থেকে বাংলা: শর্টওয়েভের মাধ্যমে হৃদয়ের সংযোগ

যুদ্ধের গতিপথ যখন বদলে গেল, ১৯৪৩ সালে এক চরম বিপজ্জনক ৯০ দিনের সাবমেরিন যাত্রা শেষে নেতাজী পৌঁছালেন এশিয়ায়। কিন্তু এশিয়ায় পা রেখেই তিনি প্রথম যে কাজটি করেছিলেন, তা-ও ছিল রেডিওর মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানো।

১৯৪৩ সালের ১৯ জুন, রেডিও টোকিও (NHK)-র অতি-শক্তিশালী শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে তিনি আবার গর্জে উঠলেন। বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন—তিনি ফিরে এসেছেন ভারতের পূর্ব সীমান্তে। এসেছেন  ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী (INA) গঠন করে চূড়ান্ত স্বাধীনতার লড়াই শুরু করতে।

এরপর সিঙ্গাপুর ও রেঙ্গুন থেকে যখন আজাদ হিন্দ রেডিও সম্প্রচার শুরু করল, নেতাজী প্রায়শই তাঁর মাতৃভাষা বাংলায় বক্তব্য রাখতেন। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ মন্বন্তর কিংবা ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সেই কঠিন দিনগুলোতে, সেন্সরশিপের বাধা পেরিয়ে শর্টওয়েভ রেডিওর মাধ্যমেই বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে যেত তাঁর বার্তা। অবরুদ্ধ সেই দিনগুলোতে তাঁর প্রতিটি বাংলা শব্দ ছিল মুক্তিকামী মানুষের একমাত্র সান্ত্বনা ও প্রেরণা।

গোপনে রেডিও শোনা: শর্টওয়েভের সেই জাদুকরী দিনগুলো

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই দিনগুলোর কথা কল্পনা করাও কঠিন। ব্রিটিশ আমলে আজাদ হিন্দ রেডিও বা রেডিও টোকিও শোনা ছিল মারাত্মক অপরাধ। ধরা পড়লে মিলত কঠোর শাস্তি। তবুও, সূর্য ডুবলেই বাংলার ঘরে ঘরে কাঠের বিশাল রেডিও সেটগুলোর সামনে মানুষ এসে জড়ো হতো। ডায়াল ঘুরিয়ে, স্ট্যাটিক আর ফেইডিংয়ের মধ্য থেকে প্রিয় নায়কের কণ্ঠটি খুঁজে নেওয়ার যে ব্যাকুলতা - তা কেবল একজন সত্যিকারের রেডিওপ্রেমীই বুঝতে পারবেন।

হাজার মাইল দূরের একটি কন্ঠস্বর সমুদ্র আর পাহাড় ডিঙিয়ে শ্রোতার কানে পৌঁছে দিতে তখন প্রয়োজন হতো বিশাল অ্যান্টেনা অ্যারে, উচ্চ-ভোল্টেজের বাল্ব ট্রান্সমিটার আর আয়নোস্ফিয়ারের করুণা। কিন্তু সবকিছুর ওপরে যেটা প্রয়োজন ছিল, তা হলো - মাইক্রোফোনের পেছনের মানুষটি আর রেডিওর সামনে বসে থাকা মানুষটির মধ্যকার এক অদৃশ্য আবেগের বন্ধন।

কেন আজকেও প্রাসঙ্গিক নেতাজীর এই রেডিও ইতিহাস?

আজ আমরা হাই-স্পিড ইন্টারনেট আর ঝকঝকে ডিজিটাল ভিডিওর যুগে বাস করি। যোগাযোগ এখন বড্ড সহজ। কিন্তু যে যুগে প্রতিটি বার্তা পাঠাতে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করতে হতো, সেই যুগে দাঁড়িয়ে নেতাজী প্রমাণ করেছিলেন, একটি খাঁটি বার্তা এবং সততার শক্তি যেকোনো ভূ-রাজনৈতিক সীমানাকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে।

আজও যখন আমরা রাতে শর্টওয়েভ রিসিভারের সামনে বসি এবং বাতাসের খসখসে শব্দের মধ্য থেকে দূরবর্তী কোনো স্টেশনের সিগন্যাল ভেসে ওঠে, তখন আসলে আমরা সেই গৌরবময় ইতিহাসেরই স্পর্শ পাই। শর্টওয়েভ রেডিও কেবল সংবাদ কিংবা বিনোদন পরিবেশন করেনি, এটি বহন করেছে মানবতা, প্রতিবাদের ভাষা এবং স্বাধীনতার সুর। আজ বহু বছর পরেও তা ইথারের আকাশে একইভাবে প্রতিধ্বনিত হয়। আমাদের আবেগততাড়িত করে, হয়ে উঠি নস্টালজিক। 



Readers' Choice