Saturday, August 29, 2026

প্রাগ থেকে শান্তিনিকেতন: ইথারের ডানায় ভেসে আসা এক স্বর

প্রাগ থেকে শান্তিনিকেতন

গভীর রাতে রেডিওর ডায়ালটা ঘোরানোর সময় ঘড়ঘড় শব্দের আড়াল থেকে ভেসে আসা দূরের কোনো অচেনা সিগন্যালের একটা আলাদা অনুভূতি আছে। এই অনুভূতি শুধু শর্টওয়েভ রেডিওর পুরোনো শ্রোতা আর ডিএক্সাররাই হয়তো ঠিকভাবে বুঝতে পারবেন। আজকের ইন্টারনেট আর অ্যাপের যুগে স্পর্শহীন যোগাযোগের ভিড়ে আমাদের সেই রেডিও ছিল একটুকরো আবেগ, এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে ভেসে চলা মানুষের আকুতি আর স্বপ্নের সেতু।

আজকে আপনাদের এমন এক ঐতিহাসিক রেডিও সম্প্রচারের গল্পে ফিরিয়ে নিয়ে যাব, যা বিশ্ব বেতারের ইতিহাসে এক অনন্য নজির গড়েছিল। গল্পটি ১৯৩৭ সালের এক কনকনে শীতের রাতের।

প্রাগের বরফঢাকা রাত আর ১৯৩৭ সালের সেই বার্তা

সেদিন ছিল ১৯৩৭ সালের ২৪শে ডিসেম্বর, বড়দিনের আগের রাত। ইউরোপজুড়ে তখন ঘনিয়ে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিষাক্ত কালো মেঘ। চেকোস্লোভাকিয়ার অস্তিত্ব তখন একনায়কতন্ত্রের হুমকিতে বিপন্ন। ঠিক সেই চরম অস্থিরতার দিনে প্রাগের ‘রেডিওজার্নাল’ (বর্তমান রেডিও প্রাগ ইন্টারন্যাশনাল) সিদ্ধান্ত নিল তারা আন্তর্জাতিক শর্টওয়েভ তরঙ্গে বিশ্বজুড়ে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেবে।

সেই রাতে রেডিও মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়ালেন চেকোস্লোভাকিয়ার কিংবদন্তি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী কারেল চ্যাপেকযার নাম বিশ্বসাহিত্যে অমর হয়ে আছে 'রোবট' শব্দটির জন্মদাতা হিসেবে।

তিনি ইউরোপের তীব্র আতঙ্ক আর উদ্বেগ বুকে চেপে রেডিওর মাধ্যমে সোজা বার্তা পাঠালেন সুদূর বাংলার শান্তিনিকেতনে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্দেশ্যে।

আমরা আপনাকে চেকিয়া থেকে অভিবাদন জানাই"

মাইক্রোফোনে চ্যাপেকের সেই কণ্ঠস্বর প্রাগের আকাশ থেকে ইথার তরঙ্গে চড়ে উড়াল দিল হাজার হাজার মাইল দূরে। বাংলায় তখন শীতের শান্ত রাত, শান্তিনিকেতনে বিশ্বকবির নীরব প্রাঙ্গণ।

চ্যাপেক তার বার্তায় বললেন, "আমরা আপনাকে চেকিয়া থেকে অভিবাদন জানাই।" এক প্রান্তে ইউরোপে যখন অস্ত্রের গর্জন, অন্যপ্রান্তে এশিয়াতেও যুদ্ধ শুরু হয়েছে, ঠিক তখন চ্যাপেক তার বার্তায় রবীন্দ্রনাথকে সম্বোধন করে দুই মহাদেশের শান্তির স্বপক্ষের মানুষদের এক হওয়ার আকুল আবেদন জানালেন।

আন্তর্জাতিক বেতারের ইতিহাসে এই একটা শব্দগুচ্ছই এক বিশাল সেতু তৈরি করে দিয়েছিল। সেই সম্প্রচারে আরও এক পরিচিত নাম জড়িত ছিলেনচেক ভারততত্ত্ববিদ ভিঞ্চেন্স লেনসনি, যিনি শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত প্রিয় বন্ধু ছিলেন।

কেন এই সম্প্রচার শর্টওয়েভপ্রেমীদের কাছে এক ইতিহাস?

বিশ্বের বেতারপ্রেমীদের কাছে এই সম্প্রচারটির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। জানেন কি? চ্যাপেকের কণ্ঠস্বরের সংরক্ষিত একমাত্র অডিও রেকর্ড হলো এই শর্টওয়েভ রেডিওর বার্তাটিই!

এই ঘটনার ঠিক এক বছর পর, ১৯৩৮ সালের ২৫শে ডিসেম্বর বড়দিনের দিনেই কারেল চ্যাপেক মাত্র ৪৮ বছর বয়সে মারা যান। কিন্তু শর্টওয়েভ রেডিওর সেই অলৌকিক প্রযুক্তির কারণে বিশ্বকবির উদ্দেশ্যে বলা তার বার্তাটি চিরতরে ইতিহাসের পাতায় রয়ে গেল।

আজকের বাঙালি বেতারপ্রেমীদের কাছে প্রাগ থেকে বাংলায় ভেসে আসা এই সংক্ষিপ্ত অভিবাদন কেবল এক টুকরো অডিও নয়, এটা প্রাগ আর শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের এক অনন্য স্মারক।

আধুনিক ইন্টারনেট বনাম রেডিওর সেই জাদুকরী দিন

আজকে এক ক্লিকেই পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সাথে কথা বলা যায়। কিন্তু ১৯৩৭ সালে শর্টওয়েভে নিজের গলার স্বর মহাসাগর ডিঙিয়ে অন্য মহাদেশে পাঠাতে দরকার হতো বিশাল আকৃতির অ্যান্টেনা, ভ্যাল্ভ ট্রানজিশনের শক্তিশালী প্রক্ষেপণ আর অন্য প্রান্তে একজন নিখাদ শ্রোতা, যিনি ভলিউম ঘুরিয়ে স্ট্যাটিক আর নয়েজের ভিড়ে ধরে ফেলবেন সেই সিগন্যাল।

আজকে যখনই আমরা পুরোনো ট্রানজিস্টারটার সামনে বসি, অথবা রেডিও অ্যাপের ডিজিটাল ডিসপ্লেতে কোনো আন্তর্জাতিক সম্প্রচার শুনি, একটু থমকে দাঁড়িয়ে সেই ১৯৩৭ সালের রাতের কথা ভাবা দরকার। শর্টওয়েভ রেডিও কেবল খবর বা গান শোনায়নি, এটা মানবতা, ভালোবাসা আর শান্তির এমন সব চিঠি বহন করেছে, যার অনুরণন আজ ৮৮ বছর পরও থামেনি।



Readers' Choice